২০০৫ সালের জানুয়ারি মাসের ১৭ তারিখ পর্যন্ত একটি এমপিওভুক্ত হাইস্কুলে ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলাম পূণ্যভূমি সিলেটে অবস্থিত হিন্দু সম্প্রদায়ের তীর্থস্থান ঢাকাদক্ষিণে।বিএনকে স্কুল এন্ড কলেজে দিনকাল ভালোই কাটছিল। টিউশনি ছিল। ছাত্রছাত্রীদের কাছে জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে। সেখানে আমার এক সহকর্মীর ওপর এক স্থানীয় প্রভাবশালী লোক অন্যায়ভাবে হামলা করেছিল। তিনি ছিলেন আমার খুব কাছের সহকর্মী। কুশিয়ারা বিধৌত আছিরগঞ্জের পার্শ্ববর্তী আমকোনা গ্রামের আজিজুর রহমান নামের এ মানুষটি চাকুরীতে ইস্তফা দিয়ে চলে যাওয়ার পর আমার মনটা দুমড়ে মুচড়ে যায়।তখন ক্লাস,টিউশনি, কোচিং ইত্যাদিতে খুব জোর করে মনকে বেধে রাখতাম। আজিজ সাহেব চলে যাওয়ার মাস খানেক পরে আমার চাকুরী হয়ে যায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। যেখানে ছিলাম সেখানে ভালো না লাগায় জীবনকে নতুন করে শুরু করার আশা নিয়ে ২০০৫ সালের ১৮ জানুয়ারি যোগদান করি মানিকপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। আমার বুকে নতুন স্বপ্ন এবং জীবনে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় ধ্বনিত হচ্ছে।
বাঘাসুরার মানিকপুরে এর আগে কখনো যাইনি। কাজে যোগদান উপলক্ষে যাওয়া। কী ঘন কুয়াশা ছিল তা বলে বুঝাতে পারবনা। কনকনে ঠান্ডা। ঢাকা দক্ষিণের চেয়ে তিনগুণ বেশি। রঘুনন্দন পাহাড় ও রাবার বাগান থেকে ধেয়ে আসা শৈত্য প্রবাহের কামড় আমাকে সেদিন রীতিমতো কাঁপিয়ে তুলেছিল। তখন সুন্দরপুর স্ট্যান্ডে কোনো দোকান চোখে পড়েনি। ম্যাক্সি থেকে নেমে সোজা পূর্ব দিকে রাস্তা ধরে হেঁটে গ্যাসফিল্ডের পাকশালা গেইটে গিয়ে কয়েকটি দোকান খোলা পেলাম। সেখানে চা খেয়ে একজনের সহায়তায় স্কুলে পৌঁছি। এভাবেই প্রথম দিন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হলো আমার অভিষেক।
কেটে গেল কয়েকটি দিন। তখন চারদিকে বোমাবাজি। সাবেক অর্থমন্ত্রী কিবরিয়া সাহেব বোমা হামলায় বৈদ্যের বাজারে নিহত হয়েছেন। রাজনৈতিক পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ। ২৭ তারিখ স্কুলে পৌছুতে অনেক কাঠখড় পোহাতে হলো। মনটা ভালো ছিলনা। কিবরিয়া সাহেব আমার হৃদয়ের মানুষ ছিলেন। অনেক কষ্টে পাঠদানে মনোনিবেশ করলাম।
এর কয়েক দিন পরের কথা। নতুন চাকুরী। মাধবপুর সোনালী ব্যাংকে একাউন্ট খোলতে হবে। ব্যাংকে সব ডকুমেন্টস নিয়ে যাওয়া সত্বেও আমাকে একাউন্ট খোলতে দিচ্ছে না।কী যেন কী কড়াকড়ি চলছিল। ব্যাবস্থাপক সাহেব বললেন, এমপ্লয়মেন্ট সার্টিফিকেট নিয়ে যেতে। আমি বললাম, একাউন্ট ফরমে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মহোদয়ের স্বাক্ষর এনেছি। ব্যবস্থাপক তা মানলেন না।কেন মানলেন না জানিনা। আমার ব্যাচের নিয়োগপ্রাপ্ত অন্য শিক্ষকবৃন্দ কীভাবে একাউন্ট খোলতে পেরেছেন তা জানারও সুযোগ ছিলো না। কারণ সেলফোনের ব্যবহার তখনো ব্যাপকভাবে শুরু হয়নি। আমি আহত পাখির মতো একটি চেয়ারে কিছুক্ষণ বসে রইলাম। কী করব মাথায় কাজ করছিল না। উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মহোদয়ের সাথে যোগাযোগ করলাম। তিনি বললেন, একাউন্ট খোলা না খোলা ব্যাংকের এখতিয়ার। আমি বললাম ফোন করে আমার বিষয়ে ম্যানেজারকে বলে দিতে যেন আমার একাউন্ট খোলতে সহায়তা করে। এ সময় হঠাৎ কী একটা কাজে তিনি অফিস ত্যাগ করলেন।
শিক্ষা অফিস থেকে বের হয়ে আমি উপজেলা গেইটের কাছে এসে দাঁড়িয়ে রইলাম। হঠাৎ মাথায় একটা বুদ্ধি এলো। এখনকার এলজিইডি ভবনে ছিল তখন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়। সিদ্ধান্ত নিলাম বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বলবো। অফিসের দরজায় দাঁড়িয়ে দেখলাম ইউএনও জি এম জাফরুল্লাহ স্যার মাধবপুর উপজেলার কয়েকজন চেয়ারম্যানকে নিয়ে কথা বলছেন। আমি সালাম দিয়ে অনুমতি নিয়ে অফিসে ঢুকলাম। পরিচয় দিয়ে আমার কথা আমি বললাম। তিনি ফোন করে ম্যানেজার সাহেবকে আমার কথা বললেন। আমার ব্যাংক একাউন্ট হলো। আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বিউটি হোটেলের দিকে গেলাম। [চলবে ]

Comments
Post a Comment