Skip to main content

হাকালুকি হাওরে ভূত আর আমি

 


দুই হাজার সালের ১২ ডিসেম্বর আমার জীবনের একটি আনন্দের দিন। কুয়াশার সাদা বেড়ি পারি দিয়ে কুলাউড়া সদর থেকে রিক্সায় চড়ে পৌঁছে গেলাম ঘাটের বাজার। সেখান থেকে পায়ে হেঁটে প্রায় তিন কিলোমিটার অতিক্রম করে হাকালুকি হাওর পাড়ের গৌড়করণ মাদরাসায় পৌঁছে গেলাম।মেজাজটা ফুরফুরে। শরীরে আনন্দের উষ্ণতা। হাকালুকি হাওরের তীব্র হিমেল বাতাস বইছে। 

গৌড়করণ পৌঁছে দেখি, টিনশেড এলশেইপের লম্বা একটি পাকা ভবন। পূর্ব দিকের দেয়ালে কালো রং দিয়ে আর্ট করা নাম- গৌড়করণ নুরুল ইসলাম দাখিল মাদরাসা। তখন সকাল সাড়ে নয়টা বেজে চলেছে। 

মাদরাসার অফিস ও সবগুলো শ্রেণিকক্ষ খোলা। অনেক ছাত্রছাত্রীর কোলাহল। আমি অফিসে ঢুকলাম। সুপার মহোদয়,  ম্যানেজিং কমিটির সহসভাপতি নছিব উল্লাহ সাহেব , সৌকত সাহেব ও আরো কয়েকজন উপস্থিত। আমি কাজে যোগদান করলাম। 

সুপার মহোদয় আমাকে প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে পরিচয় করিয়ে দিলেন। মাদরাসায় বিএসসি ছিলোনা, তাই তিনি আমাকে নবম - দশম শ্রেণির গণিত পড়াতে বললেন। আমি আনন্দ চিত্তে পড়াতে শুরু করলাম। আমি ইংরেজির মানুষ, পড়াই গণিত। নাইন-টেনে আমার উচ্চতর গণিত ছিল। কোনো সমস্যা হয়নি। শ্রেণি কার্যক্রম ভালোই উপভোগ করতে লাগলাম।

আমার লজিং হলো গৌড়করণ গ্রামের বিশিষ্ট মুরুব্বি নিম্বর আলী সাহেবের বাড়িতে। তিনি খুব পরহেজগার ও কামেল লোক ছিলেন। আমাকে খুব স্নেহ করতেন। তাঁর দুই ভাই আসিদ আলী ও হায়াত আলী সাহেবানের সন্তানদের পড়ানোর দায়িত্ব পরল আমার ওপর। রাতে একবেলা পড়ানো। সকালে আমি অন্যদের টিউশনি করতে পারবো। মনটা আনন্দে ভরে গেল। 

সুপার মহোদয় একদিন মাদরাসার কাজে কুলাউড়া ইউএনও অফিসে আমাকে নিয়ে গেলেন। ইউএনও স্যার পদাধিকার বলে মাদরাসা কমিটির সভাপতি ছিলেন। তখন  কুলাউড়া উপজেলার ইউএনও ছিলেন হাবিবুর রহমান খাঁন।স্যার সচিবালয়ে ছিলেন। সেখান থেকে কুলাউড়াতে পোস্টিং হয়েছিল। তিনিই আমার নিয়োগকর্তা ছিলেন। স্যারের ব্যবহার আমাকে খুব মুগ্ধ করতো।আমার একটা দোষ ছিল। এরকম বড় অফিসার হওয়ার স্বপ্ন লালন করতে পারতাম না।

ইউএনও স্যারের অফিসে কাজ সেরে মিলি প্লাজায় একটি ট্র্যাভেলস অফিসে আমাকে নিয়ে গেলেন সুপার মহোদয়। সেখানে মতিন সাহেবের সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তিনি তাঁর দুই মেয়ের পড়ানোর দায়িত্ব দিলেন আমার ওপর। প্রতিদিন সকালে গৌড়করণ থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার পূর্ব দিকে শাহপুর গ্রামে গিয়ে পড়ানোর দায়িত্ব আমি নিয়েছি সুপার মহোদয়কে সন্তুষ্ট করার জন্য। কারণ মতিন সাহেবের সাথে সুপার মহোদয় অনেক ঘনিষ্ঠ। 

প্রতিদিন সকালে শাহপুর যাই।মনোযোগ দিয়ে পড়াই।সকালের খাবার মতিন সাহেবের বাড়িতে খাই।হাকালুকির শাপলার লতি দিয়ে ছোট চিংড়ির তরকারি এতো বেশি ভালো লাগতো যে আমি এই তরকারি দিয়েই পেট পুরে খেতাম। এ তরকারির স্বাদ আজ অবধি ভুলতে পারিনি। 

বর্ষা মৌসুমে নৌকা দিয়ে শাহপুর ও গৌড়করণের মাঝ দিয়ে বয়ে চলা বান্না নদী পাড়ি দিতাম।


 বর্ষা বিদায় হয়েছে। মেয়ে দুটোর  টেস্ট পরীক্ষা আসছে। টেস্ট পরীক্ষায় যাতে ওরা ভালো করতে পারে সেজন্য মাঝে মধ্যে লজিং বাড়িতে কোনো অনুষ্ঠান থাকলে ওদেরকে গিয়ে পড়াতাম। 

এক রাতের কথা। আকাশে চাঁদের আলোয় জোছনা নেমেছে। জোছনার আলোর ঝিলিক লেগে হাকালুকি দোলছে।বান্না নদীর পানিতে কিরণের অসম্ভব সুন্দর খেলা।কাছেই শোনা যায় শিয়ালের হাঁক। রাত তখন এগারোটা পেরিয়ে গেছে। ইসলামগঞ্জ বাজারের দিকে বান্নার কিনারা দিয়ে হাওড়ের পাশ ধরে নির্ভয়ে এগিয়ে চললাম শাহপুর থেকে লজিং বাড়িতে পৌঁছার  উদ্দেশ্যে। সামনে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু হঠাৎ আমার সামনে দাঁড়ায় এক বিশাল কুকুর। একটা গরুর মতো বড় হবে। ভালোমতো তাকালাম। ওটা কুকুরই দেখতে । এতো বড়ো কুকুর আমি দেখে হতভম্ব। একেবারে আমার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। এর দুটো চোখ জ্বলজ্বল করছে। আমার শরীর শিউরে ওঠে। মাথা ঘামতে থাকে। আমি জ্ঞান হারালাম না। কুকুরকে বললাম, আমি মুসাফির। তোমার কোনো ক্ষতি করিনি।তোমার পথে তুমি যাও,আমার পথে আমি। একথা শুনে কুকুরটা আমার পথ ছেড়ে দিয়ে অন্যদিকে চলে গেল। এটা যে ককুরনা তখন বুঝতে পারলাম।

Comments

  1. সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে গেল।

    ReplyDelete

Post a Comment

সাম্প্রতিক খবর

'রুম টু রীড ' এর ' শিক্ষিত শিশু বিশ্ব পরিবর্তনের সূচনা'

  'রুম টু রীড ' এর ' শিক্ষিত শিশু বিশ্ব পরিবর্তনের সূচনা' 'রুম টু রীড ' একটি আন্তর্জাতিক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা যা ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। প্রতিষ্ঠালগ্ন  থেকে সংস্থাটি শিশুদের পঠন দক্ষতা উন্নয়ন এবং পাঠ্যাভ্যাস গড়ার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত, উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশে স্বাক্ষরতা কর্মসূচি এবং মেয়ে শিশুদের শিক্ষা সহায়তা নিয়ে এ সংস্থাটি কাজ করছে। বর্তমানে বিশ্বের ২৯টি দেশে এর কার্যক্রম বিস্তৃত হয়েছে। সংস্থাটি সেসব দেশের মাতৃভাষার স্বাধীন -সাবলীল পাঠক তৈরিতে কার্যকর ভূমিকা রাখছে।  ২০০৯ সালে 'রুম টু রীড '  বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করে। এটি বাংলা ভাষায় শিশুদের পঠন দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্যে নানামুখী কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এর মধ্যে অন্যতম হলো - বিদ্যালয় ভিত্তিক পাঠাগার স্থাপন ও বইপড়া কর্মসূচি।  শিশুরা নিজের মাতৃভাষায় যাতে পঠন দক্ষতা অর্জন করতে পারে সে লক্ষ্যে 'রুম টু রীড ' ছাপা সমৃদ্ধ শিখন পরিবেশ নিশ্চিত করছে। পাঠাগার কেন্দ্রিক এ ছাপা সমৃদ্ধ শিখন পরিবেশ দক্ষ পাঠক তৈরিতে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। এতে নবীন -প্রবীণ লেখকদের বিভিন্ন গল্...